বাদশাহী খিচুড়ি
গল্পটা ২০১৫ সালের। আমি এস এস সি পাশ করে ভর্তি হই সাপাহার সরকারি কলেজে। আমার বাসা থেকে কলেজের দুরত্ব প্রায় ১০ কি মি.। তাই যাতায়াতের সুবিধার্তে আমি সহ এইচ এস সি ২য় বর্ষের ৩ জন বড় ভাই মিলিয়ে চৌধুরি পাড়ায় একটা বাসা ভাড়া নিলাম। সাকিলা আন্টিদের বাসায়। আঙ্কেলের কথা না বলে আন্টি বল্লাম কারন সংসারের মূল চাবিকাটি আন্টির হাতেই ছিলো। আমরা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম ঠিকই কিন্তু খাওয়া দাওয়া করতাম মিলন ভাইয়ের মেসে। খুব ভালোই যাচ্ছিলো দিনগুলি। হাসি আনন্দ খেলাধুলা ঘোরাফেরাই কিভাবে যে দিনগুলি যাচ্ছিলো বুঝতেই পারছিলাম না। কিন্তু খাবার আমার জন্য় খুব একটা সুবিধা জনক না হোয়ায় আমার সাস্থ্য় ক্রমশ খারাপ হয়ে যেতে থাকল। তাই আমি এর একটা বিকল্প উপায় খুজতে থাকলাম। অবশেষে একটা দারুন উপায় খুজে পেলাম। আমি প্রস্তাব করলাম যে সামনের মাস থেকে আমরা নিজেরা রান্না করে খাব। আমি সবাইকে সব কিছু বুঝিয়ে সুজিয়ে বল্লাম এবং সবাই আমার কথায় রাজিও হয়ে গেলো। শুরু হলো আমাদের এক নতুন অভিজ্ঞতার জীবন। একরকম সাংসারিক জীবন বলা চলে। তখন আমাদের খাবারের এক দারুন আইটেম ছিলো যেটা প্রতিদিন তিন বেলাই আমরা খেতাম। যেটা না খেয়ে আমরা থাকতেই পারতাম না। সেই অমৃতের নামটি হলো আলুর ভর্তা।
ধীরে ধীরে সময় যেতে থাকল। কাওছার,মুজাহিদ ভাই,সানোয়ার ভাই একে একে সবাই বিদায় নিলো। পুরোতনদের মধ্য়ে থাকলাম শুধমাত্র আমি। মাঝখানে অনেকেই এলোগেলো। তবে দীর্ঘ সময় ধরে থেকেছি আমি জাকির এবং সাকিল। আমরা খুব খুব খুব মজা করতাম, মীলেমিশে থাকতাম। কত কি না করেছি আমরা।
আমাদের নতুন জীবন শুরু হলো। আমাদের ডাইনিং ব্যবস্থা দিন দিন বাড়তে থাকলো। আমরা নতুন নতুন খাবার রান্না করা শিখলাম। এখন আমরা খিচুরি রান্না করতে পারি, পাপড় ভাজতে পারি আরো কত কি! আশেপাশের প্রতিবেশী আন্টি ভাবি কাকিরাও আমাদের ভীষণ ভালোবাসত। তাদের খুবই মিশতাম গল্প করতাম।
Suddenly একটা দিন আসলো বাসা পুরাই খালি। রাতেও নাকি কেউ থাকাবেন না। আমাকে একাই থাকতে হবে। ভেবেছিলাম কোন একটা বন্ধুর মেসে গিয়ে থাকব। কিন্তু তা আর হলো কই! সাকিলা আন্টি যাবার আগে উনার বাসার পুরো দায়িত্ব আমার হাতে অর্পন করে গেলেন।
কি আর করার! আন্টি কে ত আর না বলতে পারছিনা, এটাও বলতে পারছিনা যে আন্টি আমার ভয় করছে। আন্টি আমায় জিজ্ঞেস করেই বসলেন "মাহমুদুল, বাবা তোমার ভয় করবে না তো?" আমি হাসি মুখে "বল্লাম না না কি যে বলেন আন্টি, ভয় করবে কেন, আমিতো এখন অনেক বড় হয়ে গেছি, ছোট বেলা একটু ভয় করতাম, এখন আর তেমন ভয় টয় করিনা।" নিজের আত্বসম্মান টুকু বাচাবার জন্য একথা বলেছিলাম আমি। গেলাম একেবারেই ফাসিয়ে।
ভাবছি এখন কি করা যায়! কোন বন্ধুকে আসতে বলব! হঠাত মনে হলো নাহ কাউকেই নিয়ে আসব না। আমি একাই থাকব। এভাবে একা থাকলে নতুন অভিজ্ঞতা পাব। তখন ছিলাম আমি অভিজ্ঞতার কাঙ্গাল। কোথায় নতুন অভিজ্ঞতা পাব সেটাই খুজতাম। আর কথায় কথায় বলতাম নতুন অভিজ্ঞতা নিব। নতুন অভিজ্ঞতার জন্য যে কোন ধরনের Risk নিতে পারতাম তখন। আসলে আবেগটা একটু বেশিই ছিলো।
বিকেল হলো ভাবছি রাতে কি রান্না করা যায়। হঠাত মনে হলো আরে আমিতো খিচুরি ভীষণ পছন্দ করি। আজ রাতে জীবনের সেরা খিচুরিটা রান্না করা। রান্না করব পৃথিবীর সেরা খিচুরি।
ইন্টারনেট থেকে কৌশল টা শিখে নিলাম, জেনে নিলাম কি কি লাগবে। পাশাপাশি মার কাছেও ফোন করে জেনে নিলাম সবকিছু। বিকেলে বাজার থেকে চাল,ডাল,তৈল,শাক-সবজি মসলা সহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় সবকিছুই কিনে ফেল্লাম। আমার ক্ষুধাটাও বেড়ে গেছিলো। পেটের না মনের। ভাবছি আজকের খিচুরিটবতো দারুণ হবে, আজ সারারাত খিচুরি খাব আর সিনেমা দেখব। যেই ভাবনা সেই কাজ, সন্ধ্যা হলো, সবকিছু ধীরে ধীরে একটু একটু করে Ready করলাম। আমি ভীষণ Exited ছিলাম। মনে হচ্ছিলো বিশ্ব জয় করতে যাচ্ছি। মূলত আমার টার্গেট ছিলো পৃথিবীর সেরা খিচুরিটা আজকে আমি রান্না করব। তারপর সব বন্ধুদেরকে আমার এই আজকের স্বরণীয় বরণীয় রাতটির কথা Share করব। আমি সব কিছু Ready করে বিসমিল্লাহ ছাড়াই Rice কুকারে তুলে দিলাম। একটা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনে প্রশান্তির হাসি নিয়ে রুমে প্রবেশ করলাম। হেডফোনটা কানে লাগিয়ে গান শুনতে থাকলাম। ১৫ মিনিট পর পর খেয়াল করলাম নাকে তেমন কোন সুঘ্রান কুঘ্রান আসছে না। ভাবলাম কি ব্যাপার আমার নাকে কোন প্রবলেম হলো নাতো! বাইরে এসে রাইস কুকারে খেয়াল করলাম বেচারা অফ হয়ে বসে আছে। অন করে দিয়ে আবার রুমে চলে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর টের পেলাম কি যেন পুরে যাচ্ছে বাইরে এসে বুঝতে পারলাম এটা ভিন্ন কিছু না আমার রাইস কুকারে পট পট করে শব্দ হচ্ছে ।তাড়াহুড়ো করে রাইস কুকারের বাটি টা উঠালাম খেয়াল করে দেখলাম আমি বাটির বডির পানি মুছি নাই। যার কারনে কুকারের কয়েল পানির সংস্পর্ষে কোয়েলের এক অংশ পুরে গেছে। আর ঠিক একারনেই পট পট করে শব্দ হচ্ছিলো। আমি হতাশ হলাম কিন্তু আমাকেতো খিচুরি বানাতেই হবে। বাটি সুন্দরভাবে মুছে পরিষ্কার করে বিসমিল্লাহ বলে তুলে দিলাম। সাথে আল্লাহর কাছে প্রার্থনাও করলাম। ১০ মিনিট পর খেয়াল করে দেখলাম আমার সপ্ন পূরন হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভয় হচ্ছিলোনা না জানি কোয়েলটা সম্পূর্ন ভাবেই পুরে যায়। ভিতর থেকে মন বলে উঠল "যা হবার হবে কিন্তু খিচুরি তোকে বনাতেই হবে।"
অবশেষে আমার খিচুরি রান্না হয়ে গেলো। আমি তীব্র আনন্দের সাথে রাইস কুকার টি বন্ধ করলাম, বাটিটা উঠালাম। বাটি উঠাতে গিয়ে দেখি আমার কোয়লের অবস্থা খুব করুন। ভাবলাম যাই হোক খিচুরিটা তো হলো। খিচুরির বাটি টা রুমে নিয়ে গিয়ে থালাতে উঠালাম জুড়োতে দেবার জন্য। অধির আগ্রহে বসে আছি কখন আমার জিহ্বা আমার খিচুরির পরশ পাবে। ১ সেকেন্ড কে ১ ঘন্টা মনে হচ্ছিলো। অবশেষে সে সময় আসল।
আমি পরম তৃপ্তি নিয়ে এক মুঠো খিচুরি আমার মুখে তুলে নিলাম। আমি উপলদ্ধি করলাম something is missing. কিছু একটার অনুপস্থিতি উপলদ্ধি করলাম। আমার মন ভার হয়ে আসল, আমার Exitedness আমাকে ছেড়ে চলে গেলো, এ পৃথিবীকে খুব অসহ্য লাগতে লাগল, মনে হচ্ছিলো সবকিছুকে লন্ড ভন্ড ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেই। অবশেষে বুঝতে পারলাম আমার রান্না করা রাজকীয় বাদশাহী খিচুরিতে না দিয়েছি আমি ঝাল না দিয়েছি লবন।
আজ আমার সত্যিই মনে হলো, আজ আমি পৃথিবীর সেরা খিচুরি রান্না করতে পেরেছি। যেটা আজ পর্যন্ত কোন রাধুনিই করতে পারে নাই।
No comments